সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছে পশ্চিমবঙ্গে : নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতায় ১২ জন নিহত

Published Time

May 4, 2021, 4:38 pm

Updated Time

May 4, 2021, 4:38 pm
violence-has-spread-in-west-bengal
নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতায় ১২ জন নিহত

নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতায় উত্তাল ভারতের পশ্চিমবঙ্গে ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে। নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতায় উত্তাল হয়ে উঠেছে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য। গত রোববার বিধানসভা ভোটের ফলাফলে তৃণমূল কংগ্রেস বড় জয় পাওয়ার পর রাত থেকেই পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন স্থানে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে।

জানা গেছে, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় ভোটের ফলাফল পরবর্তী সহিংসতায় ছড়িয়ে পড়েছে। খুন, মারধর, বোমাবাজি আর বাড়ি ভাঙচুরের ঘটনা ঘটছে পশ্চিমবঙ্গের একাধিক এলাকায়। 

ভারতের পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনের আগের চেয়ে বেশি প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে ফল প্রকাশের পর। ফল ঘোযণার দিন গত রোববার দুপুর থেকে গত সোমবার গভীর রাত পর্যন্ত রাজনৈতিক সংঘাতে ১২ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে বিজেপির ৫, তৃণমূলের ৫ ও আইএসএফের ১ জন রয়েছেন বলে জানা গেছে। অপর এক ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। 

বহু জায়গায় একে অন্যের বিরুদ্ধে ভাঙচুর, বোমাবাজি, লুট, আগুন লাগানোর অভিযোগ করেছে বিজেপি ও তৃণমূল। এই পরিস্থিতিতে রাজ্যবাসীর কাছে বার বার শান্তি বজায় রাখার আবেদন জানিয়েছেন মমতা ব্যানার্জি।

সূত্র জানায়, গত রোববার ভোটের ফল প্রকাশের পরেই কলকাতা সংলগ্ন কাঁকুড়গাছির শীতলাতলা এলাকায় এক বিজেপি কর্মীকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে তৃণমূলের বিরুদ্ধে। 

মৃত বিজেপি কর্মীর নাম অভিজিত সরকার। মৃতের পরিবারের দাবি, পশ্চিমবঙ্গে ভোটের ফল প্রকাশের পরেই পুলিশের চোখের সামনে পিটিয়ে মারা হয় অভিজিতকে। পরে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকেরা তাকে মৃত বলে ঘোষণা করেন। মৃত অভিজিত সরকার বিজেপির ট্রেড ইউনিয়নের নেতা ছিলেন। তৃণমূল কর্মীরা অভিজিতকে পিটিয়ে খুন করেছে বলে অভিযোগ করেছেন মৃতের ভাই বিশ্বজিত সরকার।

এদিকে, দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার সোনারপুরে রাজনৈতিক সহিংসতার বলি হয়েছেন আরেক বিজেপি কর্মী। ঘটনাটি ঘটেছে সোনারপুর দক্ষিণ বিধানসভার কেন্দ্রের অন্তর্গত প্রতাপনগর অঞ্চলের মেটিয়রিতে। 

মৃত হারান অধিকারী বিজেপি সমর্থক ছিলেন বলে জানা গেছে। এ ছাড়াও আহত হয়েছেন টুসি অধিকারী, রেখা অধিকারী, রাজু অধিকারী, পরান অধিকারী এবং বসু অধীকারী। অভিযোগ, গত রোববার দুপুরে ফল ঘোষণার পর থেকেই এলাকায় বোমাবাজি শুরু হয়। বিজেপির পতাকা ছিঁড়ে দেওয়া হচ্ছিল। 

তার প্রতিবাদ করতে গেলে পাড়ার এক নারীকে মারধর করা হয়। সেই ঘটনার প্রতিবাদ জানাতে পাড়ার ছেলেরা এগিয়ে এলে তাদেরকেও মারধর করা হয়। মারধরে গুরুতর জখম হন হারান অধিকারী। পরে তাঁকে হাসপাতলে নিয়ে যাওয়া হলে সেখানেই তার মৃত্যু হয়। 

পাশাপাশি ভোটের ফল ঘোষণার পরেই কলকাতার বেলাঘাটা এলাকায় স্থানীয় বিজেপি প্রার্থী কাশীনাথ বিশ্বাসের বাড়িতে অগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। পরে দমকল কর্মীরা এসে আগুন নেভায়। এই ঘটনায় এলাকায় তীব্র উত্তেজনা ছড়ায়।

কলকাতা সংলগ্ন সুকান্তনগর এলাকাতেও ভোটের ফল ঘোষণার পর বিজেপি নেতাদের বাড়িতে হামলা ও বোমাবাজি হয় বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। 

স্থানীয় বেশ কয়েকজন বিজেপি নেতার বাড়ি টার্গেট করে বোমাও ছোঁড়া হয়। কলকাতার অভিজাত এলাকা বিধাননগরেও বিজেপি কর্মীরা আক্রান্ত হন বলে জানা যায়।

কলকাতার যাদবিপুর এলাকায় বাম নেতাদের বাড়িতেও হামলা হয় বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। ভোটের ফল প্রকাশের পরেই যাদবপুরের বিভিন এলাকায় স্থানীয় বাম নেতাদের বাড়ি লক্ষ্য করে চলে বোমাবাজি।

অন্যদিকে, উত্তর ২৪ পরগণা জেলার দেগঙ্গা বিধানসভার কদম্বগাছীতে এক আইএসএফ কর্মী খুন হন বলে জানা গেছে। মৃতের নাম হাসানুজ্জামান। অভিযোগ, সোমবার সকালে মাঠে কাজ করার সময় তৃণমূলের কর্মীরা হাসানুজ্জামানকে মাঠ থেকে তাড়া করে বোমা মেরে খুন করে। এই ঘটনায় ব্যাপক চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে এলাকায়।

এ ছাড়াও ভোটের ফলাফল পরবর্তী সহিংসতা ছড়িয়েছে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলাতে। উত্তর ২৪ পরগনা জেলার ঘোলা থানা এলাকায় বিশ্বজিত ধর নামে এক বিজেপি কর্মীর বাড়িতে ভাঙচুর চালানো হয় বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এমনকী তার বাড়ির কাছে লাগানো সিসিটিভি ক্যামেরাও ভেঙে দেওয়া হয়।

অন্যদিকে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে ভোটের ফল-পরবর্তী সহিংসার অভিযোগে চিঠি পাঠিয়েছে রাজ্য বিজেপি। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বিরোধী রাজনৈতিক দলের কর্মীরা কেন নির্বাচনোত্তর সহিংসার শিকার হচ্ছেন, সে ব্যাপারে রাজ্যের কাছে রিপোর্ট চাওয়া হয়েছে। 

রাজ্যপাল জগদীপ ধনখড়ের সঙ্গে এ ব্যাপারে বৈঠক করেন রাজ্য পুলিশের ডিজি নীরজনয়ন পাণ্ডে এবং কলকাতার পুলিশ কমিশনার সৌমেন মিত্র। পরে, রাজ্যপালের সঙ্গে দেখা করেন স্বরাষ্ট্রসচিব হরিকৃষ্ণ দ্বিবেদী। রাজ্যপালের দ্বারস্থ হয়েছে বিজেপিও।

গত সোমবার সন্ধ্যায় মমতা তার সঙ্গে দেখা করতে গেলে তা কাছে বিষয়টি তোলেন রাজ্যপাল। মমতা তাকে বলেন, রাজ্যের আইনশৃঙ্খলার বিষয়টি এখন নির্বাচন কমিশনের অধীনে রয়েছে। তবু মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে তিনি যা করার করছেন।

কলকাতায় সংবাদ সম্মেলনে তৃণমূল নেত্রী বলেছেন, সবার কাছে আবেদন করব, বাংলা শান্তিপ্রিয় জায়গা, সংস্কৃতিপ্রিয় জায়গা, সম্প্রীতিপ্রিয় জায়গা। নির্বাচনে হার-জিত হয়েছে। 

আবহাওয়া গরম হয়েছে কখনও, কখনও ঠান্ডা হয়েছে। বিজেপি অনেক অত্যাচার করেছে এটা আমরা জানি। কেন্দ্রীয় বাহিনী অনেক অত্যাচার করেছে জানি। তা সত্ত্বেও সবাইকে বলব, শান্ত থেকে যেন কেউ কোনও হিংসাত্মক ঘটনায় না জড়াই। এখন মানুষের সবচেয়ে বড় কাজ, মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে কোভিডের বিরুদ্ধে লড়াই করা।

এদিকে, গত ৪ মাস ধরে পশ্চিমবঙ্গে ঘৃণা ছড়িয়েছে মোদি-অমিত শাহ বলে মন্তব্য করেছেন তৃণমূল কংগ্রেসের জাতীয় মুখপাত্র ডেরেক ও'ব্রায়েন। সহিংসতার ঘটনা বিজেপির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের পরিণাম বলে দাবি করে তিনি বলেন, ফলপ্রকাশের পর ট্রোলারদের ছুটি দিতে পারত বিজেপির আইটি সেল।  

প্রতিটি ঘটনাই দলের অন্তর্কলহ। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির তিনটি দল রয়েছে। পরস্পরকে তারা ঘৃণা করে। গত ৪ মাস ধরে মো-শা (মোদি ও অমিত শাহ) এখানে এসে ঘৃণা ছড়িয়েছে। শান্তি ও সম্প্রীতি চায় পশ্চিমবঙ্গ। বিভাজন চায় বিজেপি।

নির্বাচনে একাধিকবার বাংলাদেশ ও তৃণমূল কংগ্রেসকে নিয়ে নানা বিতর্কিত বক্তব্য রেখেছে উগ্র হিন্দুত্ববাদী দল বিজেপির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। বাংলাদেশিদের বারবার অনুপ্রবেশকারী হিসেবে কটাক্ষ করেছে তারা।

এদিকে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভায় চরম ভরাডুবির পর ধর্মীয় বিভেদের জন্য অনেক ভুয়ো খবরও ছড়াচ্ছে বিজেপি বলে অভিযোগ করেছেন সিপিআইএমের আলোচিত নেত্রী ঐশী ঘোষ।

দিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদের সভানেত্রী ঐশী বলেন, ধর্মীয় বিভেদের জন্য অনেক ভুয়ো খবরও ছড়ানো হচ্ছে। বাম কর্মী-সমর্থকরা হামলার শিকার হলেও যে কোনও তথ্য শেয়ার করার আগে তা যাচাই করে নেবেন।  

জেএনইউ বিশ্ববিদ্যালয়ে আক্রান্ত হয়ে রক্তাক্ত হয়েছিলেন দুর্গাপুরের বাসিন্দা ঐশী ঘোষ। তার সেই ছবি বিশ্বজুড়ে আলোড়ন ফেলে দেয়। অভিযোগ, আরএসএসের শাখা সংগঠন এবিভিপি তার ওপর হামলা করে। ঐশীর ওপর হামলার ঘটনায় ভারতজুড়ে প্রবল আন্দোলন হয়েছিল।

নির্বাচনী প্রচারণায় বিজেপি বারবার বলেছে, তারা দুই শতাধিক আসনে জিতবে। এজন্য প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতারা পশ্চিমবঙ্গে বারবার সফর করেছেন। নানা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এমনকি মিঠুন চক্রবর্তী ও শ্রাবন্তীর মতো জনপ্রিয় একঝাঁক অভিনেতা-অভিনেত্রীদেরও মাঠে নামিয়েছে। তৃণমূলের শতাধিক নেতাকে দলে বাগিয়ে নিয়েছিল।

এত কিছুর পরও নির্বাচনে জিততে পারেনি, বিভিন্ন আসনে বিশাল বিশাল ব্যবধানে হেরেছে নরেন্দ্র মোদির দল। এমনকি ২০১৯ সালে জেতা সংসদীয় আসনগুলোতেও চরমভাবে ধরাশায়ী হয়েছে বিজেপি। দুই শতাধিক আসনে রেকর্ড গড়ে আবারও পশ্চিমবঙ্গের মসনদে মমতার দল।



Recent News

Available at

© 2019 - Maintained by EZEN Software & Technology Pvt. Ltd