ভারতে শক্তি উৎসের সবুজায়ন এবং কর্মসংস্থানের ভবিষ্যৎ

Published Time

February 21, 2022, 8:25 pm

Updated Time

February 21, 2022, 8:49 pm
the-source-of-energy-in-india-is-for-green-revolutions-and-for-future-job-employment
ছবি প্রতিনিধিত্বমূলক

বর্তমানে সারাবিশ্বে জীবাশ্মজ্বালানি থেকে দূষণমুক্ত শক্তি উৎপাদনের দিকে রূপান্তরের একটি প্রয়াস চলছে । এই বহুস্তরীয় পরিবর্তন একদিকে যেমন পরিবেশবান্ধব, অন্যদিকে তা বেশকিছু সমস্যার সৃষ্টি করে যার মধ্যে অন্যতম কর্মসংস্থানের ভৌগোলিক এবং উৎসগত বৈষম্য। 

ভারতবর্ষে তাপবিদ্যুৎ উৎপাদনের মূল কাঁচামাল কয়লা এবং পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তির উৎসগুলির মধ্যে একটি গুরুতর ভৌগোলিক প্রভেদ রয়েছে। একদিকে দেশের পূর্বাঞ্চল বিশেষত পশ্চিমবঙ্গ, ছত্রিশগড়, ঝাড়খন্ড, উড়িষ্যা ইত্যাদি রাজ্যগুলি কয়লা এবং প্রাকৃতিক গ্যাসে সমৃদ্ধ। অন্যদিকে ভারতের পশ্চিমাঞ্চলের রাজ্য যেমন রাজস্থান সৌর বা বায়ুচালিত পুননর্বীকরণযোগ্য শক্তি উৎপাদনের ক্ষেত্রে অনেক বেশি সম্ভাবনাময়। শক্তির প্রচলিত উৎস থেকে অপ্রচলিত উৎসে ধীর পরিবর্তনের ফলে খনিজসম্পদ সমৃদ্ধ পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলিতে কয়লা ও কয়লানির্ভর শিল্পে নিযুক্ত কর্মীরা জীবিকা নির্বাহের ক্ষেত্রে প্রতিকূলতার সম্মুখীন হবেন। অন্যদিকে সৌর এবং বায়ু শক্তিতে পশ্চিমা রাজ্যগুলি চাকরি ক্ষেত্রে নতুন সুযোগ তৈরি করবে। এই পরিস্তিতিতে যে প্রশ্নগুলি স্বভাবতই উঠে আসে তা হল- 

১/ কয়লা যেখানে আঞ্চলিক অর্থনীতির মূল বুনিয়াদ সেইসব অঞ্চলের ভবিষ্যৎ এই রূপান্তরের মাধ্যমে কিভাবে নির্ধারিত হবে?

২/ এই রূপান্তরের দরুন যে কাঠামোগত পরিবর্তন আসবে তা পূর্ব থেকে পশ্চিমভারতে পরিযায়ী শ্রমিকের সংখ্যা এবং তাদের আর্থসামাজিক অবস্থাকে কিভাবে প্রভাবিত করবে?

৩/ পুননর্বীকরণযোগ্য শক্তিক্ষেত্রে যে কাজগুলি সৃষ্টি হবে তা কি কয়লাখনি এবং কয়লাভিত্তিক শিল্প যেমন তাপবিদ্যুৎ উৎপাদন এর সঙ্গে যুক্ত লক্ষাধিক স্থায়ী এবং অস্থায়ী শ্রমিক পুনর্নিয়োগে সক্ষম হবে?যদি না হয়, তবে এর ফলে যে বেকারত্বের সৃষ্টি হবে তার সমাধান হবে কিভাবে?

প্রথমত প্রাকৃতিক সম্পদভাণ্ডার এই অঞ্চলগুলিতে বসবাসকারী ও নির্ভরশীল জনগোষ্ঠী এবং শ্রমিকদের সুষ্ঠু এবং স্বচ্ছল জীবনযাপনের দিকে দৃষ্টি রেখে নীতিনিয়োগ প্রয়োজন। একই সঙ্গে আমাদের একথা মনে রাখতে হবে যে ক্রমবর্ধমান পুননর্বীকরণযোগ্য শক্তিক্ষেত্র, জীবাশ্ম জ্বালানি শিল্পের মতো শ্রমভিত্তিক নয়। একাধিক সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে যে সমস্ত কয়লাখনি পিছু যে বিপুল পরিমাণ সৌরক্ষমতা প্রতিস্থাপন করতে হবে তা আমাদের বর্তমান সৌরপ্রকল্পগুলির যৌথ ক্ষমতার বহুগুণ যা করায়ত্ত হওয়া প্রায় অসম্ভব। উপরন্তু, এই পরিসংখ্যান কেবলমাত্র স্থায়ী শ্রমিকসংখ্যার ভিত্তিতে। এর সঙ্গে অস্থায়ী শ্রম যুক্ত হলে প্রয়োজনীয় পরিধি স্বভাবতই আরো বেশি হবে। 

এ বিষয়ে আর একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো, অধিকাংশ সময়ই দূষণমুক্ত শক্তিক্ষেত্রে কর্মসংস্থানের সর্বোচ্চ সুযোগ নির্মাণ পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকে। দূষণমুক্ত শক্তি প্রকল্পের পাহারাদার কিংবা সুরক্ষাকর্মী পদে কেবলমাত্র অস্থায়ীভাবে বহাল করার পরিবর্তে লিখিত চুক্তির ভিত্তিতে স্থায়ী কর্মসংস্থান এবং সামাজিক সুরক্ষাবলয়- এর বিষয়গুলিকে আরো গুরুত্ব দিতে হবে। এ বিষয়ে নিরপেক্ষ, সর্বাত্মক ও বিস্তারিত আলোচলা দরকার।

দ্বিতীয়ত, কয়লা ও কয়লাভিত্তিক শিল্পে জড়িত শ্রমিকদের পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তিক্ষেত্রে অথবা অর্থনীতির অন্যান্যক্ষেত্রে পুনর্নিয়োগের জন্যে কারিগরি দক্ষতা উন্নয়নের বিশেষ প্রয়োজন। কর্মসংস্থান সুনিশ্চিত করতে এ বিষয়ে সুচিন্তিত পরিকল্পনা ও কর্মসূচি তৈরি করতে হবে।একইসঙ্গে পুরনো কয়লা খনি এবং তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রগুলিকে পরিত্যাগ করার পরিবর্তে সরকারকে আরো স্থিতিশীল অর্থনীতি গড়ে তোলার লক্ষ্যে এই জায়গাগুলির বিকল্প ব্যবহারের পথ তৈরি করতে হবে। এর জন্য আবশ্যক কৌশল বিধি, প্রযুক্তি এবং নীতি নিয়োগের বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে। 

একথা অনস্বীকার্য যে পুননর্বীকরণযোগ্য শক্তির ইতিবাচক প্রভাব অপরিসীম অপরিসীম এবং লক্ষণীয়। তবে সেই সঙ্গে অর্থনীতির ওপর এর নেতিবাচক দীর্ঘমেয়াদী প্রভাবও বিবেচনা করা দরকার। এ বিষয়ে বিশদ গবেষণার অভাবে অনেক সময় তথ্যগত অসমতা এবং একপেশে পর্যালোচনা শক্তির রূপান্তরের প্রভাব সম্বন্ধে আমাদের সম্যক ধারণা দিতে ব্যর্থ হয়। তাছাড়া তথ্যভিত্তিক আলোচনার পরিধি আরো ব্যপ্ত হওয়া প্রয়োজন যেখানে পরিসংখ্যান এর পাশাপাশি গুণগত সূচকগুলিও সমান গুরুত্ব পাবে।

অংশীদারদের বর্তমান অবস্থান এবং তাদের উপর এই রূপান্তরের অবাঞ্ছিত নেতিবাচক প্রভাব প্রশমনের জন্য সাংগঠনিক এবং পদ্ধতিগত ব্যবস্থার উপর জোর দেয়া প্রয়োজন। জলবায়ু পরিবর্তনের কথা মাথায় রেখে আনুষঙ্গিক পরিবেশ দূষণ কমানোর পাশাপাশি কর্মসংস্থান এবং আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন সুনিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর এবং পরিবেশের অন্তর্ভুক্তিকরণ একান্তই জরুরি। ভারতের মতো দেশে শক্তির রূপান্তরকে সফল করতে হলে ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে সকল অংশীদারদের একটি সার্বিক আলোচনায় যোগদান করতে হবে। সরকারের তরফ থেকে নীতিগত হস্তক্ষেপ, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং অর্থনীতির অন্যান্য প্রকল্পে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানো ও পর্যাপ্ত বিনিয়োগের দিকে দৃষ্টি দেয়া বিশেষ প্রয়োজন। 

সুচরিতা ভট্টাচার্য, পলিসি এনালিস্ট, কাটস্ ইন্টারন্যাশনাল 



Recent News

Available at

© 2019 - Maintained by EZEN Software & Technology Pvt. Ltd