বাতাসেও ছড়াচ্ছে করোনাভাইরাস

Published Time

April 17, 2021, 8:59 pm

Updated Time

April 17, 2021, 8:59 pm
coronavirus-is-also-spreading-in-the-air
প্রতীকী

এখন বাতাসের মাধ্যমে করোনাভাইরাস (সার্স-কোভ-২) সংক্রমিত হয় বলে প্রমাণ পেয়েছেন এক দল গবেষক। করোনাভাইরাস যে বায়ুবাহিত রোগ, তার সপক্ষে ‘ধারাবাহিক ও শক্তিশালী’ প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে মেডিকেল জার্নাল ল্যানসেট। 

যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার ছয় বিশেষজ্ঞের একজন কোঅপারেটিভ ইনস্টিটিউশন ফর রিসার্চের রসায়নবিদ ও কোলোরাডো বোল্ডার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক জোস-লুইস জিমনেজ। তিনি বলেন, এটি যে বায়ুবাহিত রোগ তার পক্ষে শক্তিশালী প্রমাণ পাওয়া গেছে। সে তুলনায় বড় আকারের ড্রপলেটের মাধ্যমে সংক্রমণের প্রমাণ অনেক কম।

অক্সফোর্ডের ক্রিস গ্রিনহালগের নেতৃত্বে একটি বিশেষজ্ঞ দল প্রকাশিত ওই গবেষণাটি পর্যালোচনা করেছে। তারা বায়ুবাহিত রোগ হিসেবে এটিকে চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে প্রমাণ পেয়েছেন।

আরেক গবেষক কিম্বারলি প্রাথার বলেন, অবাক করার মতো বিষয় হলো এখনো মানুষ করোনা বায়ুবাহিত কি না, এ নিয়ে প্রশ্ন করছেন। অথচ বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে অনেকগুলো ঘরোয়া সংক্রমণের ঘটনা শুধু বায়ুবাহিত ভাইরাস দ্বারাই ব্যাখ্যা করা যায়। 

ল্যানসেটের ওই পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, শ্বাসযন্ত্রের ভাইরাসগুলো তিনটি প্রধান উপায়ে সংক্রমণ করে থাকে। প্রথমে যোগাযোগের সংক্রমণ, যেখানে কেউ সংক্রমিত ব্যক্তির সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করে বা ভাইরাসযুক্ত এমন কোনো কিছু স্পর্শ করে। দ্বিতীয়ত, শ্বাস-প্রশ্বাসের ছোট-বড় ভাইরাসযুক্ত ড্রপলেট সংক্রমণ দ্বারা, যা সংক্রমিত ব্যক্তির নিকটে উপস্থিতির কারণে হতে পারে। তৃতীয়ত, ছোট ড্রপলেট এবং কণাগুলোর মাধ্যমে সংক্রমণ যা বাতাসে দীর্ঘ দূরত্বে ও সময় ধরে ভাসতে থাকে।

গবেষণাটি বলছে, ‘স্ক্যাগিট কয়ার’ (ওয়াশিংটনের একটি অনুষ্ঠান) এর মতো অনুষ্ঠানকে সুপার-স্প্রেডার (অত্যধিক হারে সংক্রামক) ইভেন্ট বলা হয়েছে, যেখানে একজন আক্রান্ত ব্যক্তি প্রায় ৫৩ জনকে সংক্রমিত করেছিলেন। 

তবে শুধুমাত্র ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে আসা, একই বস্তু স্পর্শ করা কিংবা একই ছাদের নিচে সময় কাটানোর মতো ঘটনাগুলোর মাধ্যমে সংক্রমণ ছড়ানোর বিষয়টি গবেষণার মাধ্যমে পুরোপুরি প্রমাণ করা যায়নি। এছাড়া, সার্স-কোভ-২ এর সংক্রমণের হার বাইরের তুলনায় বাড়ির ভেতর অনেক বেশি। তবে, ভেতরে সুষ্ঠু বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা করা হলে এর সংক্রমণ ব্যাপকভাবে কমে যায়।

গবেষণাটি বলছে, উপসর্গহীন ব্যক্তি, যাদের কাশি বা হাঁচি নেই, তারাও অন্যদের সংক্রমিত করতে পারেন। মোট সংক্রমণের অন্তত ৪০ শতাংশই উপসর্গহীনদের মাধ্যমে হয়ে থাকে। ছয় বিশেষজ্ঞ ওই পর্যালোচনায় জানিয়েছেন, জনস্বাস্থ্য সংস্থাগুলো যদি বায়ুবাহিত ভাইরাস হিসেবে এটিকে চিহ্নিত করে ব্যবস্থা না নেয়, তবে মানুষকে সুরক্ষিত রাখা সম্ভব না। 

ভাইরাসটি আরও ছড়িয়ে পড়বে। করোনাভাইরাসকে বায়ুবাহিত হিসেবে চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বিশ্বনেতাদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন গবেষকরা।

এদিকে, বাংলাদেশে গত এক সপ্তাহে কমেছে করোনা (কোভিড-১৯) পরীক্ষা। সেই সঙ্গে কমেছে শনাক্তকৃত রোগীর সংখ্যাও। তবে একই সময়ে বেড়েছে মৃত্যু ও সুস্থ হয়ে উঠা রোগীর সংখ্যা। গত এক সপ্তাহে অর্থাৎ চলতি বছরের এপিডেমিওলজিক্যাল ১৫তম সপ্তাহে (১১ থেকে ১৭ এপ্রিল) করোনা আক্রান্ত সন্দেহে এক লাখ ৭৭ হাজার ১৭৪টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়। 

এসব নমুনা পরীক্ষায় ৩৬ হাজার ৩১৫ জন রোগী শনাক্ত হয়। একই সময়ে ৩৬ হাজার ৪৩৭ জন সুস্থ এবং ৬২২ জনের মৃত্যু হয়। এর পূর্ববর্তী ১৪তম এপিডেমিওলজিক্যাল সপ্তাহে (৪ এপ্রিল থেকে ১০ এপ্রিল) করোনাভাইরাসে আক্রান্ত সন্দেহে দুই লাখ ২০ হাজার ৮২৮টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়। এসব নমুনা পরীক্ষায় ৪৮ হাজার ৬৬০ জন রোগী শনাক্ত, ২২ হাজার ৬০৩ জন সুস্থ এবং ৪৪৮ জনের মৃত্যু হয়।

শনিবার স্বাস্থ্য অধিদফতরের অতিরিক্ত পরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. নাসিমা সুলতানা স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। গত দুই সপ্তাহের তুলনামূলক বিশ্লেষণে দেখা যায়, নমুনা পরীক্ষা ১৯ দশমিক ৭৭ শতাংশ ও শনাক্ত ২৫ দশমিক ৩৭ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। একই সময়ে মৃত্যু ৩৮ দশমিক ৮৪ শতাংশ এবং সুস্থতা ৬১ দশমিক ২০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

বাংলাদেশে করোনা আক্রান্ত হয়ে শনিবার টানা দ্বিতীয় দিনের মতো ১০১ জনের মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে পুরুষ ৬৯ জন ও নারী ৩২ জন। এদের মধ্যে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৯৯ জন ও বাসায় দুইজনের মৃত্যু হয়। এ নিয়ে মোট মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০ হাজার ২৮৩ জন। 

একই সময়ে দেশের সরকারি ও বেসরকারি ২৫৭টি ল্যাবরেটরিতে ১৫ হাজার ৪১৩টি নমুনা সংগ্রহ ও ১৬ হাজার ১৮৫টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়। নমুনা পরীক্ষায় তিন হাজার ৪৭৩ জন নতুন রোগী শনাক্ত হয়। এ নিয়ে মোট শনাক্তকৃত রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭ লাখ ১৫ হাজার ২৫২ জন। 

গত ২৪ ঘণ্টায় নমুনা পরীক্ষায় শনাক্তের হার ২১ দশমিক ৪৬ শতাংশ। গত বছরের ৮ মার্চ প্রথম রোগী শনাক্ত হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত শনাক্তের মোট হার ১৩ দশমিক ৮৯ শতাংশ। একই সময়ে সুস্থ হয়ে উঠেছেন পাঁচ হাজার ৯০৭ জন। এ নিয়ে দেশে সুস্থ হয়ে উঠা রোগীর সংখ্যা ৬ লাখ ৮ হাজার ৮১৫ জন। 

২৪ ঘণ্টায় সুস্থতার হার ৮৫ দশমিক ১২ শতাংশ। গত ২৪ ঘণ্টায় করোনায় মৃত ১০১ জনের মধ্যে বিশোর্ধ তিনজন, ত্রিশোর্ধ্ব তিনজন, চল্লিশোর্ধ্ব আটজন, পঞ্চাশোর্ধ্ব ২৯ জন এবং ষাটোর্ধ ৫৮ জন।

একই সময়ে বিভাগওয়ারি দেখা গেছে, মৃত ১০১ জনের মধ্যে ঢাকা বিভাগে ৬৭ জন, চট্টগ্রাম ২৩ জন, রাজশাহী দুইজন, খুলনা তিনজন, বরিশাল একজন, সিলেট দুইজন এবং ময়মনসিংহ বিভাগে তিনজন রয়েছেন।

এই মহামারি কারোনাভাইরাসে বাংলাদেশে নতুন করে আরো দেড় কোটি মানুষ দরিদ্র হয়েছে বলে এক গবেষণায় জানিয়েছে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) ও বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ (বিলস)। 

শনিবার আয়োজিত ওয়েবিনারে সিপিডির গবেষণা বিষয়ক পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম এসব তথ্য উপস্থাপন করেন। ওয়েবিনারটি পরিচালনা করেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও সিপিডির বোর্ড অব ট্রাস্টির ট্রেজারার সৈয়দ মনজুর এলাহী। 

এ সময় যুক্ত ছিলেন সংসদ সদস্য ও শ্রমিক নেত্রী শিরীন আকতার, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব কে এম আবদুস সালাম, বিআইএলএসের সাধারণ সম্পাদক ও বিএনপি নেতা নজরুল ইসলাম খান, জাতীয় গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি মো. আমিরুল হক আমিন প্রমুখ।

গবেষণাপত্রে খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, করোনা দুর্যোগের সময় ৩ শতাংশ শ্রমিক চাকরি হারিয়েছেন। শহর অঞ্চলে ইনফরমাল ইকোনোমি থেকে ৬.৭৮ শতাংশ মানুষ কর্মসংস্থান হারিয়েছে। 

এছাড়া উচ্চ পর্যায়ে ১ কোটি ১১ লাখ থেকে ২ কোটি ৫ লাখ মানুষ চাকরি হারিয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি চাকরি হারিয়েছেন এসএমই ও ইনফরমাল সেক্টর থেকে। অন্যদিকে নারী উদ্যোক্তারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে রয়েছেন। এশিয়া ফাউন্ডেশনের তথ্য অনযায়ী, ৫০ শতাংশ নারী উদ্যোক্তা তাদের প্রতিষ্ঠান বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছেন।

গবেষণায় উল্লেখ করা হয়, দেশে দারিদ্র্য ক্রমশ বাড়ছে। যেখানে শ্রমনির্ভর দারিদ্র্য বেশি। এ হার ২০ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩৩ শতাংশ হয়েছে। অতিমারির প্রভাবে এ তালিকায় নতুন করে যুক্ত হয়েছে প্রায় ১ কোটি ৬৪ লাখ মানুষ।

সিপিডি বলছে, কম আয়ের শ্রমিকরা সবচেয়ে বেশি আর্থিক জটিলতায় পড়েছেন। বিলসের দেওয়া তথ্য মতে, ৪৭ শতাংশ বস্তিবাসী ও ৩২ শতাংশ শহরের বিভিন্ন আবাসিক এলাকায় বসবাসকারী খাদ্য খরচ কমাতে বাধ্য হয়েছেন। বিশ্ব ব্যাংকের এক গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষের আয় কমেছে ৩৭ শতাংশ। এর মধ্যে ঢাকায় ৪২ শতাংশ এবং চট্টগ্রামে ৩৩ শতাংশ। বেতননির্ভর মানুষের আয় কমেছে ৪৯ শতাংশ।

গবেষণা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, করোনার কারণে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়েছে দেশীয় শিল্প, নির্মাণ, পরিবহন, পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ের ব্যবসা, খাদ্য ও ব্যক্তিগত সেবা। মধ্যম পর্যায়ে ঝুঁকিতে রয়েছে, আর্থিক খাত, অভ্যন্তরীণ পরিষেবা, আবাসন ও শিক্ষা খাত। এছাড়া কম ঝুঁকিতে রয়েছে কৃষি, স্বাস্থ্য, তথ্য ও যোগাযোগ খাত। ফলে শহর অঞ্চলের ৬৯ শতাংশ কর্মজীবী মানুষ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।

ওয়েবিনারে সংসদ সদস্য ও শ্রমিক নেত্রী শিরীন আকতার বলেন, করোনা পরবর্তী সময়ে শ্রমবাজার পুনরুদ্ধারে আমাদের কাজ করতে হবে। এক্ষেত্রে সামাজিক সংলাপ গুরুত্বপূর্ণ। 

বিভিন্ন দেশ করোনা নিয়ন্ত্রণ করে কীভাবে অর্থনীতি পুনরুদ্ধার করছে তা নিয়ে আলোচনা করতে হবে। তিনি বলেন, বর্তমানে দেশে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা দেড় কোটিতে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। দিনমজুর শ্রেণির শ্রমিকরা কীভাবে সামনের দিন পার করবেন তা এখন ভাবনার বিষয়।

শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব কে এম আবদুস সালাম বলেন, বর্তমানে কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে আছি আমরা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা করোনাকালীন সময়ে অত্যন্ত সফলভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। 

পাশাপাশি আমাদের ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট টিম কাজ করছে। এরই মধ্যে ২৩টি টিম ১৮৬টি কারখানা পরিদর্শন করেছে। সরকার ঘোষিত ২৩টি প্যাকেজের মধ্যে প্রথম সারিতে রয়েছে শ্রমিকদের স্বার্থসংশ্লিষ্টরা। এ থেকে বোঝা যায় শ্রমিকদের কত বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।



Recent News

Available at

© 2019 - Maintained by EZEN Software & Technology Pvt. Ltd