লাভের মুখ দেখা সত্তেও কলকাতায় আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের তৈরি শতাব্দী প্রাচীন Bengal Chemicals বেসরকারিকরণের সিদ্ধান্ত ভারত সরকারের

নিউজ ডেস্ক
কলকাতা

Published Time

September 16, 2020, 10:11 pm

Updated Time

September 16, 2020, 10:11 pm
center-announced-privatization-of-bengal-chemicals
সফল স্যানি

দেশের বেশ কিছু সরকারি প্রতিষ্ঠান যে বেসরকারিকরণ করা হবে সে কথা জুলাই মাসেই জানিয়েছিলেন অর্থমন্ত্রী। সম্প্রতি কেন্দ্র প্রকাশ করল সেই প্রতিষ্ঠানগুলির তালিকা। 

তালিকায় থাকায় ২৬টি রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার মধ্যে নাম এল শতাব্দীপ্রাচীন প্রতিষ্ঠান বেঙ্গল কেমিক্যালসেরও (Bengal Chemicals)।

১৮৯২ খ্রিস্টাব্দে আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় (Prafulla Chandra Roy) কলকাতার ৯১ আপার সার্কুলার রোডে বাড়ি ভাড়া করে ৭০০ টাকার মূলধন নিয়ে বেঙ্গল কেমিক্যাল ওয়ার্ক স্থাপন করেন। 

প্রফুল্লচন্দ্র বাঙালি তরুণদের মধ্যে উদ্যোগী মনোভাব গড়ার উদ্দেশ্যে এবং ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ সরকারের চাকরির বিকল্প হিসেবে এই সংস্থাকে প্রতিষ্ঠা করেন। ১৮৯৩ খ্রিস্টাব্দে কলকাতার ইন্ডিয়ান মেডিক্যাল কংগ্রেসের ভেষজ পণ্য উৎপাদনে এই সংস্থা দায়িত্ব নেয়।

কোম্পানির খ্যাতি বৃদ্ধি পেলে, বিজ্ঞানী রায় উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য কোম্পানিতে ২ লক্ষ টাকা অতিরিক্ত মূলধন যোগ করেন। সংস্থাটি একটি লিমিটেড কোম্পানি রূপে প্রতিষ্ঠিত হয়। 

১২ এপ্রিল ১৯০১ খ্রিস্টাব্দে ভারতের প্রথম ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে ‘বেঙ্গল কেমিক্যালস অ্যান্ড ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড’। 

১২০ বছরের ইতিহাসে বারবার ভারতের ত্রাতা হয়ে দাঁড়িয়েছে বেঙ্গল কেমিক্যাল। ১৯২৩ সালে গোটা উত্তরবঙ্গে প্রবল বন্যার সময় লক্ষ লক্ষ ঘরছাড়া মানুষকে সাহায্যের জন্য এগিয়ে এসেছিল। প্রফুল্লচন্দ্র রায় তৈরি করেছিলেন বেঙ্গল রিলিফ কমিটি। 

তার মধ্যেই বাংলায় নতুন উপদ্রব হিসেবে উঠে আসে কলেরা আর টাইফয়েড। সেখানেও এগিয়ে এসেছিল এই প্রতিষ্ঠান।

প্লেগের হাত থেকে বাঁচার অন্যতম শর্ত হল বাড়ি পরিষ্কার ও পোকামাকড় মুক্ত রাখা। কিন্তু স্যানিটাইজেশনের যে সরঞ্জাম বিদেশ থেকে আমদানি হতো, তার দাম ছিল সাধারণের ধরাছোঁয়ার বাইরে। এগিয়ে আসে সেই বেঙ্গল কেমিক্যালস। দেশীয় পদ্ধতিতে প্রস্তুত হয় ফিনাইল আর ন্যাপথালিন বল।

 সরকারকেও সাহায্য করেছে এই প্রতিষ্ঠান। ১৯১৪ সাল, চলছে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ । যুদ্ধের জন্য ব্রিটিশ সরকারের কিছু অ্যাসিড এবং রাসায়নিক পদার্থ প্রয়োজন । এতদিন সেসব দ্রব্যের জন্য নির্ভর করা যেত জার্মানির উপর। কিন্তু এখন তো জার্মানি প্রতিপক্ষ দল। তাহলে উপায়? 

এবারও ত্রাতার ভূমিকায় বেঙ্গল কেমিক্যালস। যুদ্ধের যাবতীয় রাসায়নিক দ্রব্য উৎপাদনের দায়িত্ব তুলে নিল নিজের কাঁধে। এখানেই শেষ নয়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়েও আহত সৈনিকদের জন্য ওষুধের ব্যবস্থা করে বেঙ্গল কেমিক্যালস, অগ্নিযুগের বিপ্লবীরাও নানা সময়ে সাহায্য পেয়েছেন এই সংস্থা থেকে।

স্বাধীনতার পর পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝি সময় থেকেই অর্থনৈতিক টানাপড়েন শুরু হয়েছিল এই কারখানায়। ১৯৭৭ সালে অর্থনৈতিক মন্দা থেকে এই কারখানাকে ফিরিয়ে আনতে উদ্যোগ নিয়েছিল কেন্দ্রীয় সরকার। মর্যাদা দিয়েছিল রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা হিসাবে। 

পরে ১৯৮০ সালে বেঙ্গল কেমিক্যালস অ্যান্ড ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডকে জাতীয়করণ করে তৎকালীন সরকার।

 

তবে তারপরেও কাটেনি অর্থনৈতিক সংকট। টানা কয়েক দশক ধরেই লোকসানে চলছিল এই কারখানা। 

তবে ২০১৬-১৭ সাল থেকে আবার ব্যবসায় ফিরতে শুরু করেছিল বেঙ্গল কেমিক্যালস। যা শিখরে পৌঁছায় এই করোনার (Covid-19) জন্যেই। 

সম্প্রতি একদিনে প্রায় ৫২ হাজার বোতল ফিনাইল তৈরি করে রেকর্ডও গড়েছিল এই সংস্থা। বেঙ্গল কেমিক্যালসে তৈরি স্যানিটাইজার ‘বেনস্যানি’-ও জনপ্রিয় হয়েছে। 

কিন্তু ফিনাইল বা স্যানিটাইজার বাঁচাতে পারল না শতাব্দীপ্রাচীন ঐতিহ্যকে। কেন্দ্রীয় সরকারের ঘোষণায় বলা হয়েছে এই ২৬টি রাষ্ট্রায়ত্ব সংস্থা দীর্ঘদিন ধরেই লাভের মুখ দেখছে না। কিন্তু গত কয়েক বছরের রিপোর্ট থেকে স্পষ্ট, ক্ষতির মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে না বেঙ্গল কেমিক্যালস। তা হলে কেন কোপ বেঙ্গল কেমিক্যালে!

ভারতের রাজকোষের ঘাটতিকে এককালীন বড় অঙ্কের টাকার প্রয়োজনের জন্যই কি সরকার বেছে নিল এই রাস্তা? লাভ থাকার পরেও তাই বেসরকারি সংস্থার হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে প্রতিষ্ঠানকে?


Related Posts

loading
Recent News

loading
Available at

© 2019 - Maintained by EZEN Software & Technology Pvt. Ltd