
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের এখনো বাকি প্রায় আড়াই বছর। এরই মধ্যে নির্বাচনের প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করেছে বড় দুই দল আওয়ামী লীগ-বিএনপিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলো। এরইমধ্যে বড় দুইটি রাজনীতিক দলসহ সব দলই তৃণমূল পর্যায়ে সংগঠন গুছিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। গত মঙ্গলবার নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোও নির্বাচন কমিশনের (ইসি) তাদের আয়-ব্যয়ের হিসাব দেয়া শেষ করেছে।
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পুরো ভোটগ্রহণ ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএম) করার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে ইসি। আর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এ বছরই কেনা হচ্ছে আরো প্রায় ৩৫ হাজার ইভিএম মেশিন। সব মিলিয়ে দেশের রাজনীতি নির্বাচনি হাওয়া বইতে শুরু করেছে। রাজনৈতিক বিশ্নেষকরা বলছেন, আবারো কারসাজির নির্বাচনের শঙ্কা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এতে জাতি হিসেবে চরম সংকটের দিকে ধাবিত হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন না হলে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের পথও রুদ্ধ হয়ে যাবে। তাই বিএনপিসহ বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর সাংগঠনিক দুর্বলতা দ্রুত কাটিয়ে তুলতে হবে। নইলে সুষ্ঠু নির্বাচনের কাঙ্ক্ষিত দাবি আদায় করা সম্ভব নয় বলে মনে করছেন তারা।
সংবিধান অনুযায়ী আগামী ২০২৩ সালের শেষের দিকে কিংবা ২০২৪ সালের শুরুর দিকে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন হওয়ার কথা। এর আগেই আওয়ামী লীগ নিজেদের গুছিয়ে নেবে। ২০২২ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে আওয়ামী লীগের জাতীয় ত্রিবার্ষিক সম্মেলন আয়োজনের প্রস্তুতি রয়েছে। তার আগেই ৭৮টি সাংগঠনিক জেলাসহ উপজেলা, থানা, পৌরসভা, ইউনিয়ন এবং ওয়ার্ড পর্যায়ের সম্মেলন আয়োজনের প্রস্তুতি ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। এছাড়াও দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও জাতীয় কাউন্সিলকে সামনে রেখে সাংগঠনিক রোডম্যাপ নির্ধারণে আগামী ৯ সেপ্টেম্বর সকাল ১০টায় আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার সরকারি বাসভবন গণভবনে সীমিত পরিসরে বৈঠকে বসছে টানা তিন মেয়াদে ক্ষমতায় থাকা দল আওয়ামী লীগ। ওই বৈঠকে সরকারি দল হিসেবে সমসাময়িক ইস্যুসহ নানা বিষয়ে সাংগঠনিক রোডম্যাপ নির্ধারণ করে আগামী জাতীয় নির্বাচনকে লক্ষ্য রেখে তৃণমূল থেকে সংগঠনকে সুসংগঠিত করার কৌশল নির্ধারণ করতে যাচ্ছে দলটি।
আওয়ামী লীগের কয়েকজন জেষ্ঠ্য নেতা বলেছেন, তৃণমূল সম্মেলনের পর পুরোদমে আগামী সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি নেওয়া হবে। একইসাথে ভোটের হিসাব-নিকাশ মেলানোর জন্য কয়েকটি ইসলামী দলের সাথে সখ্য বাড়ানোর চিন্তাভাবনা করছে আওয়ামী লীগ। একই চিন্তা রয়েছে কয়েকটি বামপন্থি রাজনৈতিক দল নিয়েও। এ ব্যাপারে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া গেলে মহাজোটে নির্বাচনি জোটের পরিধি বাড়ানো হবে। অপরদিকে রাজনীতির মাঠে কোণঠাসা রাজপথের বিরোধী দল বিএনপিও দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচন টার্গেট করে ভেতরে ভেতরে সাংগঠনিক প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে। নিয়েছে তৃণমূলকে শক্তিশালী করার উদ্যোগ।
প্রথমেই তৃণমূল পর্যায়ে সংগঠন গুছিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ রয়েছে। এরপর সুনির্দিষ্টভাবে চারটি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে।
বিএনপির একাধিক সূত্র জানায়, আগামী দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন নির্দলীয় সরকারের অধীনে অবাধ ও সুষ্ঠুভাবে অনুষ্ঠানে এক দফা দাবিতে ‘নতুন রূপে’ আন্দোলনে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছে বিএনপি। এবারের আন্দোলনকে ‘বাঁচা-মরার’ লড়াই হিসেবে বিবেচনায় নিয়েই ঢাকার রাজপথ দখলের প্রস্তুতি নিচ্ছেন তারা। সরকারবিরোধী সব রাজনৈতিক দলকে নিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলন গড়ে তোলার পরিকল্পনা করছে দলটির হাইকমান্ড। আগামী নির্বাচন ঘিরে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোটের শরিকের সংখ্যা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন কয়েকজন শীর্ষ নেতা। বর্তমানে জাতীয় পার্টিকে নিয়ে কিছুটা দুশ্চিন্তা থাকলেও নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে তাদের আরো কাছে টানার ভাবনা রয়েছে। ১৪ দলীয় জোটের শরিকদের সঙ্গে সম্পর্কের আরো উন্নয়ন ঘটানোর উদ্যোগ থাকবে।
এছাড়া বেশ কয়েকটি জেলায় ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক থাকায় সাংগঠনিক কার্যক্রমে কিছুটা স্থবিরতা এসেছে। দ্বন্দ্ব-বিবাদ লেগেই আছে। নানামুখী জটিলতাও তৈরি হয়েছে। এমনকি রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে। রাজশাহী, সিরাজগঞ্জ, পাবনা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, মাগুরা, সাতক্ষীরা, নরসিংদী, চট্টগ্রাম মহানগর, কক্সবাজারে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি এবং সিরাজগঞ্জ, নরসিংদীতে ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকরা দায়িত্ব পালন করছেন। এই জেলাগুলোতে আগেভাগে সম্মেলন করার প্রস্তুতি রয়েছে। ইতোমধ্যে চট্টগ্রাম মহানগরের সম্মেলন নিয়ে কেন্দ্রীয় নেতারা জেলা নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। তাছাড়া বছর দেড়েক আগে সম্মেলন হলেও কয়েকটি জেলার পূর্ণাঙ্গ কমিটি এখনো অনুমোদন পায়নি। এ নিয়ে সংশ্নিষ্ট জেলাগুলোতে সাংগঠনিক জটিলতা তৈরি হয়েছে।
সাংগঠনিক বিধান অনুযায়ী, সম্মেলন যখনই হোক না কেন-পূর্ণাঙ্গ কমিটি অনুমোদনের দিন থেকেই কমিটির মেয়াদকালের গণনা শুরু হয়। এ কারণে এবার তৃণমূল পর্যায়ে সম্মেলনের পর দ্রুত পূর্ণাঙ্গ কমিটি অনুমোদনের প্রস্তুতি রয়েছে। সেই ক্ষেত্রে আগামী বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে যেসব শাখার সম্মেলন হবে, সেসব শাখা কমিটির পূর্ণাঙ্গ কমিটি দ্রুত অনুমোদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। চলতি মাস থেকে ঢাকা বিভাগে মেয়াদোত্তীর্ণ জেলা ও উপজেলা কমিটিগুলোর সম্মেলন আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রথমেই রাজবাড়ী জেলার সম্মেলন হবে। এরপর নারায়ণগঞ্জ জেলা কমিটির সম্মেলন আয়োজনের প্রস্তুতি রয়েছে। দলের জাতীয় সম্মেলনের আগেই মেয়াদোত্তীর্ণ জেলাগুলোর সম্মেলন করা হবে বলে জানিয়েছেন এই বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন।
বিএনপি দলীয় সূত্র জানায়, দেশে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের দাবি আদায়ে ডান-বাম সব রাজনৈতিক দল ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে নিয়ে এক প্ল্যাটফরমে একত্র করতে চায় বিএনপি। এ ব্যাপারে দলের পক্ষে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু হয়েছে। অভিন্ন দাবিতে প্রথমে দলগতভাবে আদর্শভিত্তিক যুগপৎ আন্দোলনের কর্মসূচি এবং পরে একমঞ্চ থেকে ঐক্যবদ্ধ কর্মসূচি দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে দলটি। এরই মধ্যে ২০ দলকে কার্যত ‘নিষ্ক্রিয়’ করে রাখার কৌশল চলছে, যাতে বৃহত্তর ঐক্যজোটের পথে অন্যতম বাধা যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত জামায়াতে ইসলামীকে ধীরে ধীরে জোটের বাইরে ঠেলে দেওয়া যায়। এতে বিএনপির সঙ্গে জামায়াতের ‘সখ্য’ সরকারি দল আওয়ামী লীগ দেশে-বিদেশে ‘ব্র্যান্ডিং’ করে লাভবান হয়েছে। এবার জামায়াত ইস্যু থেকে বিএনপি বেরিয়ে আসতে এবং বিদেশিদের সামনে নিজেদের নতুন অবস্থান পরিষ্কার করতে চায়, যাতে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হলে বিএনপির হাত ধরে জামায়াতই ক্ষমতায় আসবে-আওয়ামী লীগ এ প্রচার চালাতে না পারে। এ বিষয়ে ঐক্যফ্রন্ট, বাম, ইসলামী দলসহ অন্যান্য দলের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করা হয়েছে।
এ বিষয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী বলেন, গভীর খাদের কিনারা থেকে ঘুরে দাঁড়াতে বিএনপিতে সৎ, যোগ্য, ত্যাগী ও মেধাবী নেতাকর্মীদের খুঁজে নেতৃত্বের আসনে বসাতে হবে। শুধু নিজেদের অযোগ্য ও অন্ধ সমর্থকদের মাধ্যমে দলের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দিয়ে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জন সুদূরপরাহত হবে। এ বিষয়ে বিশিষ্ট আইনজীবী ড. শাহ্দীন মালিক বলেছেন, রাজনৈতিক দলগুলোকে বড় দাগে দুই ভাগে ভাগ করা যায়। আদর্শের তাগিদে আন্দোলনকারী দল, আর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য রাজনৈতিক দল। আমাদের বামপন্থি দলগুলো এবং আওয়ামী লীগ আদর্শের জন্য রাজনৈতিক দল।