বাংলাদেশে শিশুদের জন্য করোনার চেয়েও বিপজ্জনক ডেঙ্গু

Published Time

August 1, 2021, 8:46 pm

Updated Time

August 1, 2021, 8:46 pm
dengue-is-more-dangerous-for-children-in-bangladesh-than-corona
করোনার চেয়েও বিপজ্জনক ডেঙ্গু

করোনাভাইরাস মহামারীর মধ্যে শিশুদের সামনে বিপদ হয়ে আসছে ডেঙ্গু, কোভিড-১৯ রোগের তুলনায় যেটিকে শিশুর জন্য বেশি ঝুঁকির বলে জানাচ্ছেন চিকিৎসকরা। তারা বলছেন, শেষ পর্যায়ে রোগী আসায় ঝুঁকি আরো বাড়ছে। আর করোনাভাইরাস সংক্রমণের এই পরিস্থিতিতে রোগ নির্ণয়ে দেরি হওয়ায় ডেঙ্গু রোগীদের বেশি ভুগতে হচ্ছে।করোনাভাইরাস সংক্রমণেও জ্বর যেমন হয়, ডেঙ্গুতেও তাই হয়। করোনাভাইরাস আর ডেঙ্গুর জোড়া প্রকোপে ব্যাপক মৃত্যু ঠেকাতে হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা ও এডিস মশার বংশবিস্তার থামাতে জোর দিতে বলছেন তারা।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলছে, কোভিড-১৯ মহামারীর মধ্যে ডেঙ্গুর প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় স্বাস্থ্যসেবা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে জরুরি পদক্ষেপ হিসেবে সব হাসপাতালে নির্দেশনা পাঠানো হচ্ছে।চলতি বছর ডেঙ্গু সন্দেহে ৪টি মৃত্যুর তথ্য এসেছে আইইডিসিআরে। বছরের প্রথম ৬ মাসে ৩৭২ জন রোগী হাসপাতালগুলো চিকিৎসা নিয়েছেন। যেখানে জুলাই মাসেই হাসপাতালে এসেছেন ২ হাজার ৯০ জন ডেঙ্গু রোগী।

বাংলাদেশে ২০১৯ সালে ডেঙ্গু সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ নিয়েছিল। সে বছর আক্রান্তের সংখ্যা এক লাখ ছাড়ালেও ২০২০ সালে ডেঙ্গুর প্রকোপ অনেকটা কম ছিল। গত বছর ১ হাজার ৪০৫ জন রোগী হাসপাতালে ডেঙ্গুর চিকিৎসা নেন। চলতি মাসেই ডেঙ্গুতে এর চেয়ে বেশি রোগী আক্রান্ত হওয়ায় জনস্বাস্থ্যের উপর চাপ বাড়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ঢাকার সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকরা বলছেন, গত কয়েকদিন ধরে এডিস মশাবাহিত এই ভাইরাস জ্বরে যেভাবে আক্রান্ত রোগী বাড়ছে, তাতে অনেক শিশুও পাচ্ছেন তারা। জ্বর, মাথা ব্যথা, চোখে ব্যথা, শরীরে ব্যথা, মুখ থেকে রক্তক্ষরণ, পেট ফুলে যাওয়া, শরীরে পানি আসা, গায়ে র‌্যাশ ওঠা-এসব লক্ষণ নিয়ে শিশুরা হাসপাতালে আসছে।দেশে এখন দ্বিতীয় সর্বাধিক ডেঙ্গু রোগী ভর্তি রয়েছে ধানমণ্ডির সেন্ট্রাল হাসপাতালে। 

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে, শুক্রবার পর্যন্ত বেসরকারি হাসপাতালটিতে ৬৪ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি রয়েছেন। তবে সেন্ট্রাল হাসপাতালের শিশুরোগ বিভাগের ইনচার্জ ও কনসালটেন্ট সুজিত কুমার রায় জানান, এই সংখ্যা ৯০ এর বেশি হবে, যার প্রায় অর্ধেকই শিশু। তিনি বলেন, গত এক সপ্তাহে ডেঙ্গুর প্রকোপ অনেক বেড়ে গেছে। আমাদের এক সপ্তাহ আগে ১০ থেকে ১২ জন ডেঙ্গু রোগী ছিল। গত তিন দিনে পেডিয়াট্রিকে ৪০ জনেরও বেশি রোগী ভর্তি হয়েছে। আর মেডিসিনে ৫০ জনের মতো ডেঙ্গুরোগী রয়েছে।

সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গু রোগী ভর্তি থাকা রাজধানীর মিটফোর্ড হাসপাতালের পরিচালক কাজী মো. রশিদ উন নবী জানিয়েছেন, গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত যে ৯৬ জন রোগী ভর্তি ছিল, তাদের ১২ জন শিশু। এছাড়া চার দিন আগে ডেঙ্গু ‘শক সিনড্রোম’ নিয়ে আসা ১১ বছরের এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে টেস্ট করার আগেই। জ্বর নিয়ে বেশি রোগী আসছে। যারা আসছেন, তাদের পে¬ইটলেটস কম থাকে। আমরা ট্রিটমেন্ট দিচ্ছি, কিন্তু রোগীর সংখ্যা দিনকে দিন বাড়ছে।সরকারি তথ্যের তুলনায় রোগীর সংখ্যা আরও অনেক বেশি বলে ধারণা এই চিকিৎসকের।  

রশিদ উন নবীর পরামর্শ, জ্বর এলে ডেঙ্গুর টেস্ট করে চিকিৎসকের পরামর্শে চলতে হবে। জ্বরের সঙ্গে বমি বা পেটে ব্যথা থাকলে অথবা হাত-পায়ে পানি আসলে অবশ্যই হাসপাতালে ভর্তি হতে হবে। ঢাকা শিশু হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক শফি আহমেদ জানিয়েছেন, প্রতিদিনই ৭-৮ জন শিশু ডেঙ্গু নিয়ে ভর্তি হচ্ছে। তার হাসপাতালে ভর্তি থাকা ২৫ জন রোগীর মধ্যে দুইজন আইসিইউতে রয়েছে। 

ডেঙ্গু ফিভার ও ডেঙ্গু শক সিনড্রোম নিয়ে আসছে। এগুলোতে অবস্থাটা বেশি খারাপ হয়ে যায়। ৪ জন শিশু মারা গেছে। শেষ পর্যায়ে তারা আসছে এবং তাদের কো-মরবিট কনডিশন নিয়ে আসছে। মেনিনজাইটিস, লিউকোমিয়া আক্রান্তরা মারা যাচ্ছে। তিনি বলেন, আউটডোরেও অনেক রোগী আসছে। অনেক শিশু আক্রান্ত হচ্ছে। আমাদের প্র্যাকটিসেও আমরা পাই। অগাস্ট-সেপ্টেম্বরে বোঝা যাবে, ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়বে কি না?

শিশুদের জন্য করোনাভাইরাসের চেয়ে ডেঙ্গুকে বেশি বিপজ্জনক হিসেবে চিহ্নিত করে অধ্যাপক শফি বলেন, কোভিডে বাচ্চাদের মাইল্ড সিম্পটম হয় এবং তাদের ঝুঁকিটা কম থাকে। কিন্তু ডেঙ্গুতে শিশুরা অনেক ঝুঁকিতে থাকে। লকডাউনে অন্যান্য রোগীর সংখ্যা কম হওয়ায় এখনও রোগী ভর্তি নিতে পারলেও আইসিইউ সবসময় পূর্ণ থাকছে বলে জানান তিনি।

আক্রান্ত শিশুদের বেশি করে জল ও জল জাতীয় খাবার দেওয়ার তাগিদ দিয়ে অধ্যাপক শফি আহমেদ বলেন, সবাই মনে করে, জ্বর কমলেই ভালো হয়ে গেছে। কিন্তু ডেঙ্গুজ্বর কমার সাথে সাথে জটিলতা বাড়তে থাকে। সেজন্য জ্বর কমার ৭২ ঘণ্টা পর্যন্ত খুবই খেয়াল রাখতে হবে। ডেঙ্গু থেকে বাঁচতে ছোট শিশুদের ফুলহাতা জামা-কাপড় পরানো এবং সবসময় মশারি টাঙিয়ে ঘুমানোর পরামর্শ দিয়েছেন এই চিকিৎসক।

সেন্ট্রাল হাসপাতালের চিকিৎসক সুজিত কুমার রায় বলছেন, তার হাসপাতলে এখন পর্যন্ত সাধারণ চিকিৎসায়ই শিশুরা সুস্থ হচ্ছে, কারোরই আইসিইউ সাপোর্টের প্রয়োজন হয়নি। বেশি মাত্রার জ্বর আসলে, মুখে অরুচি থাকলে, কিছুই খেতে না পারলে ২৪ ঘন্টার মধ্যে ডেঙ্গুর পরীক্ষা করার তাগিদ দিয়ে তিনি বলেন, চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোন ওষুধ খাওয়া যাবে না। অনেক সময় জ্বর প্যারাসিটামলে না কমলে অনেকে ক্লোফেনাক সাপোজিটরি ব্যবহার করেন। এই জাতীয় জ্বর কমানোর ওষুধে ডেঙ্গু রোগীর অবস্থা শোচনীয় হয়ে যেতে পারে। এগুলো কোনোভাবেই দেওয়া যাবে না। ডেঙ্গু হলে বাসায় থাকা নিরাপদ না, হাসপাতালে ভর্তি হওয়াই উত্তম।বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনাভাইরাস মহামারীর চাপে যেখানে হাসপাতালগুলোতে রোগী ভর্তি নেওয়ার জায়গা নেই, তার মধ্যে ডেঙ্গু রোগী বাড়তে থাকায় স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার উপর চাপ পড়ছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী মনে করেন, করোনাভাইরাস ও ডেঙ্গুর সংক্রমণ একসাথে চলায় মানুষের ভোগান্তি বাড়ছে। তিনি বলেন, জ্বর আসলেই মানুষ আগে করোনার চিন্তা করছে। যখন দেখছে করোনা হয়নি, তখন আবার ডেঙ্গুর পরীক্ষা করছে। ফলে রোগটা নির্ণয় হতে বেশি দেরি হয়ে যায় এবং রোগীর অবস্থা খারাপ হয়ে যায়। আবার একই ব্যক্তির ডেঙ্গু ও করোনাভাইরাস দুটোই হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, কেউ করোনাভাইরাস থেকে ভালো হওয়ার পথে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হচ্ছেন। কেউ ডেঙ্গুর জন্য হাসপাতালে ভর্তি হয়ে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হচ্ছে। এগুলোর ফলে মানুষ বেসামাল অবস্থায় আছে। এই চিকিৎসক বলেন, হাসপাতালে ভর্তির জায়গা নেই। 

আবার ডেঙ্গু রোগীরা করোনাভাইরাসের কারণে এক ধরনের অবহেলার শিকার হচ্ছে। এতে জনস্বাস্থ্য মারাত্মক হুমকির মধ্যে রয়েছে। ভয় পাচ্ছি যে, ডেঙ্গু যদি বাড়তে থাকে, তাহলে সামনের দিনগুলোতে আমরা কী করব? জ্বর হলে লক্ষণের জন্য অপেক্ষা না করে দ্রুত ডেঙ্গু ও করোনাভাইরাসের পরীক্ষা করতে পারলে শুরুতে রোগ নির্ণয় করে ব্যবস্থা গ্রহণ সহজ হবে বলে মনে করেন এই বিশেষজ্ঞ।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ম্যালেরিয়া ও এডিসবাহী রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার ডা. আফসানা আলমগীর খানের দাবি, মৌসুমের আগেই প্রচার চালালেও মানুষ সচেতন না হওয়ায় ডেঙ্গুর একেবারে পিকের অবস্থা চলে এসেছে। ছয়টি হাসপাতালকে ডেঙ্গু রোগের জন্য ডেডিকেটেড করে দেওয়া হবে জানিয়ে তিনি বলেন, সরকারি-বেসরকারি সব হাসপাতালে ছোট করে হলেও যেন একটি ডেঙ্গু কর্ণার থাকে, সেজন্য আমরা সব হাসপাতালে চিঠি পাঠিয়েছি। শুধু ডেঙ্গুর জন্য একটা টিম ডেডিকেট করে দিতে বলছি, যেটা ২০১৯ এও ছিল। কেউ যেন চিকিৎসা না পেয়ে ফিরে না আসে, অন্তত যেন টেস্টটা করার সুযোগ পায়। এনএস১ টেস্ট যেন বিনামূল্যে করানো হয়, সেজন্য সব হাসপাতালকে আমরা বলে দিয়েছি। চিঠিটা হয়ত রবিবারের মধ্যে পেয়ে যাবে তারা।

ডা. আফসানা বলেন, মহামারীর মধ্যে ডেঙ্গুর প্রকোপ বেড়ে যাওয়াটা আমাদের জন্য শুধু চ্যালেঞ্জ নয়, গোদের উপর বিষফোঁড়ার মতো অবস্থা হয়ে গেছে। বৃহস্পতিবার থেকে ‘মনসুন সার্ভে’ শুরু হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ডিওএইচএসে ১০টি বাসায় সার্ভে করে ৬টিতেই এডিস মশার লার্ভা পেয়েছি। যদি ডিওএইচএসের মতো জায়গায় এইডিসের লার্ভা পাই, তাহলে অন্য জায়গায় কী অবস্থা? এগুলো পাওয়া গেছে ছাদবাগান, ফুলের টব, জমানো পানির পাত্র থেকে। তবে বাসা-বাড়িতে সিটি করপোরেশনের মাধ্যমে মশা মারা হচ্ছে বলে অগাস্টের দ্বিতীয় সপ্তাহের দিকে ডেঙ্গুর প্রকোপ কমে আসার আশা করছেন তিনি।



Recent News

Available at

© 2019 - Maintained by EZEN Software & Technology Pvt. Ltd