বাংলাদেশে বাঁশখালীতে এস আলমের বিদ্যুৎ প্রকল্পে শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষে ৫ জন নিহত: পুলিশ-শ্রমিকসহ আহত অর্ধশত: জেলা প্রশাসন ও পুলিশের পৃথক দু’টি তদন্ত কমিটি: এলাকায় উত্তেজনা: অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন

চট্টগ্রাম

Published Time

April 17, 2021, 6:25 pm

Updated Time

April 17, 2021, 9:43 pm
atleast-5-killed-in-bangladesh-police-firing-in-chinese-joint-venture
শ্রমিকদের সাথে সংঘর্ষের পর উশৃংখল জনতা গাড়িতে অগ্নিসংযোগ করে

বাংলাদেশের চট্টগ্রামের সমুদ্র উপকুলবর্তী বাঁশখালী উপজেলার গন্ডামারায় দেশের অন্যতম শিল্প প্রতিষ্ঠান এস আলম গ্রুপের মালিকানা ও নির্মাণাধীন বিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়ে শনিবার( ১৭ এপ্রিল) আবারো রক্ত ঝরলো। প্রাণ গেলো ৫ শ্রমিকের। পুলিশ-শ্রমিকসহ আহত কমপক্ষে অর্ধশতাধিক।

শনিবার এ রক্তক্ষয়ী ও প্রাণঘাতি এ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এর আগেও এই বিদ্যুৎ প্রকল্পের জায়গা অধিগ্রহন-দখল নিয়ে কমপক্ষে ৫ জনের প্রানহানি ও শতাধিক আহত হয়েছিল। এস আলম গ্রুপ চীনাদের সহায়তায় ১৩২০ মেগাওয়াট কয়লাবিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রকল্পটি বাস্তবায়নের কাজ করছে। 

ঘটনা তদন্তে জেলা প্রশাসন ও পুলিশের পক্ষ থেকে দু’টি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। গঠিত তদন্ত কমিটি দু’টিকেই আগামী ৭ কার্যদিবসের মধ্যে রিপোর্ট দিতে বলা হয়েছে। 

এদিকে এস আলম কর্তৃপক্ষ নিহতদের পরিবারপিছু ৩ লাখ টাকা ও আহতদের জন্য ৫০ হাজার টাকা দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে। সংঘর্ষ ও হতাহতের ঘটনায় এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। শনিবার রাত সাড়ে আটটায় রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত মামলা হয়নি। 

এর আগে শনিবার (১৭ এপ্রিল) সকালে এস এস পাওয়ার প্ল্যান্টে বেতন ভাতাসহ বিভিন্ন দাবি-দাওয়া নিয়ে আন্দোলনে বিভিন্ন স্থাপনায় ও যানবাহনে ব্যাপক ভাঙচুর-অগ্নিসংযোগের এক পর্যায়ে পুলিশের উপস্থিতি দেখে হামলা শুরু করে শ্রমিকরা। 

উত্তেজিত শ্রমিকদের নিবৃত্ত করতে পুলিশ গুলি চালালে হতাহতের এই ঘটনা ঘটে। নিহতের সংখ্যা আরো বাড়তে পারে বলে আশংকা করা হচ্ছে। 

রক্তক্ষয়ী এ সংঘর্ষে নিহতরা হলেন, গন্ডামারা ইউনিয়নের ৮নং ওয়ার্ডের পুর্ব বড়ঘোনা গ্রামের আবু ছিদ্দিকের ছেলে আহমদ রেজা মীরহান (১৮), অলি উল্লার ছেলে রনি হোসেন (২২), নুরুজ্জামান ছেলে শুভ (২৪), দানু মিয়ার ছেলে মো. রাহাত (২২) এবং নোয়াখালীর রায়হান (২৬)। 

আহতদের মধ্যে বেশ কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে স্থানীয় সূত্রে জানানো হয়। চমেক হাসপাতালে আহতরা হলেন- হাবিব উল্লাহ (২১), মো. রাহাত (৩০), মিজান (২২), মো. মুরাদ (২৫), মো. শাকিল (২৩), মো. কামরুল (২৬), মাসুম আহমদ (২৪), আমিনুল হক (২৫), মো. দিদার (২৩), ওমর (২০) ও অভি (২২) এছাড়াও গন্ডামারা পুলিশ ফাঁড়ির তিন সদস্য আহত হয়েছেন। তারা হলেন- ইয়াসির (২৪), আব্দুল কবির ও (২৬), আসাদুজ্জামান (২৩)।

প্রসঙ্গত: ২০১৬ সালের ৪ এপ্রিল গন্ডামারা ইউনিয়নের পশ্চিম বড়ঘোনা এলাকায় একই বিদ্যুৎকেন্দ্রের জায়গা অধিগ্রহণ নিয়ে স্থানীয়দের সাথে সংঘর্ষের ঘটনায় ৪ জন নিহত হয়েছিলেন। 

ওই সময়ে বেশ কিছুদিন ধরে ওই এলাকায় স্থানীয় এক বিএনপিনেতার নেতৃত্বে কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রটির জায়গা অধিগ্রহণ নিয়ে আন্দোলন চলেছিল। ১৩২০ মেগাওয়াট কয়লাবিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রকল্পটি বাস্তবায়নের কাজ করছে দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্প প্রতিষ্ঠান এস আলম গ্রুপ। 

এই প্রকল্পের জায়গা দখল নিয়ে স্থানীয় অনেক জমি মালিকের জায়গা জোর করে দখল নিয়েছে এস আলম গ্রুপ এমন অভিযোগ অনেকের, যদির প্রতিষ্ঠানটি তা স্বীকার করেনা। বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে সহযোগিতা করছে চীনা প্রতিষ্ঠান।

শনিবারের এ সংঘর্ষ ও হতাহতের ঘটনায় চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সুমনা আক্তারকে প্রধান করে চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন। কমিটিকে আগামী সাত কার্য দিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। চট্টগ্রামের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, কলকারখানা অধিদপ্তরের কর্মকর্তা ও বিদ্যুৎ বিভাগের এক কর্মকর্তাকে কমিটির সদস্য করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন বাঁশখালী ইউএনও সাইদুজ্জামান চৌধুরী। এছাড়া অতিরিক্ত ডিআইজি (অপারেশন ও ক্রাইম) জাকির হোসেন খানকে প্রধান করে পৃথক তদন্ত কমিটি করেছে চট্টগ্রাম রেঞ্জ পুলিশ। 

এ তদন্ত কমিটিকে আগামী সাত কার্য দিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে হবে। রেঞ্জ অফিসের পুলিশ সুপার নেছার উদ্দীন ও চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের অতিরিক্ত এসপি কবির হোসনকে কমিটির সদস্য করা হয়েছে।

এদিকে এস আলম পাওয়ার প্ল্যান্টের পক্ষ থেকে নিহতদের পরিবারকে ৩ লাখ টাকা করে এবং আহতদের প্রত্যেককে ৫০ হাজার টাকা করে সহায়তা দেয়া ঘোষণা দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। 

পাওয়ার প্ল্যান্টের সমন্বয়কারী আদিল বিল্লাহ বলেন, শ্রমিকদের নিজেদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝির কারণে এই ঘটনা ঘটেছে। এই ঘটনায় প্রকল্পের অপূরনীয় ক্ষতি হয়ে গেছে। 

শ্রমিকরা আন্দোলন করতে গিয়ে পুলিশের ওপর হামলা চালিয়েছে। পুলিশ আত্মরক্ষার্থে এবং জানমালের নিরাপত্তা দিতে গিয়ে গুলি ছুঁড়েছে। এই ঘটনায় প্রকল্পের অনেক কর্মকর্তাও আহত হয়েছেন। এই ঘটনায় কোন ঠিকাদারের কোন ভুল-ক্রুটি বা গাফিলতি থাকলে তা তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার এস এম রশিদুল হক বলেন, শ্রমিকদের মধ্য অসন্তোষের বিষয়টি শুক্রবারই মিমাংসা হয়ে গিয়েছিল। শনিবার আবারো তারা আন্দোলন-বিক্ষোভ করতে থাকে।

এতে কোন একটি পক্ষ উসকানি বা ইন্ধ দিয়েছে বলে আমরা ধারণা করছি। তারা বিদেশী কর্মকর্তাদের ওপর হামলা চালায়। অনেক স্থাপনা ও যানবাহনে আগুন দেয়, পুলিশের ওপরও হামলা চালায়। পুলিশ আত্মরক্ষার্থে এবং জানমালের নিরাপত্তা দিতে গিয়ে গুলি ছুঁড়েছে। এই ঘটনায় বাইরের লোকের ইন্ধন রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সুত্রমতে, প্রায় ২৫০ কোটি ডলারের এ প্রকল্পে শ্রমিক সরবরাহের কাজ করে মূলত বেসরকারি বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। 

এগুলো হলো, মাহি এন্টারপ্রাইজ, এনআরএম এন্টারপ্রাইজ, রকিব এন্টারপ্রাইজ, আলী এন্টারপ্রাইজ, আদিবা এন্টারপ্রাইজ, ইমা এন্টারপ্রাইজ, উজ্জ্বল এন্টারপ্রাইজ। এ বিদ্যুৎকেন্দ্রে ৭ হাজার শ্রমিক কাজ করছেন। 

প্রত্যেক শ্রমিকের জন্য বিদ্যুৎ কেন্দ্র কর্তৃপক্ষ থেকে ঘণ্টা প্রতি ১৩০ টাকা করে নেওয়া হলেও শ্রমিকদের কাছ থেকে ১০ টাকা করে রেখে দিয়ে ১২০ টাকা করে দেওয়া হচ্ছিল। এনিয়েও ক্ষোভ ছিল আন্দোলনরত শ্রমিকদের মাঝে।

প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে স্থানীয় সাংবাদিক অনুপম দে জানান, গন্ডামারা ইউনিয়নের এসএস পাওয়ার প্ল্যান্টে ১২ ঠিকাদার রয়েছে। এই ঠিকাদারদের মাধ্যমে ওই প্ল্যান্টে ১২-১৩ হাজার শ্রমিক কাজ করে। 

শ্রমিকদের বেতন ভাতা ও দৈনিক শিফিটিং ডিউটি (শ্রম ঘন্টা) নিয়ে গত কয়েকদিন ধরে কর্মরত শ্রমিক ও ঠিকাদারদের মধ্যে বিরোধ চলে আসছিল। এই বিরোধের জেরে গত শুক্রবার দুইপক্ষের মধ্যে তর্কাতর্কি ও হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। 

শনিবার (১৭ এপ্রিল) সকালে প্রকল্পের ভেতরে বিক্ষোভ শুরু করে কর্মরত শ্রমিকরা। এসময় দু’পক্ষের শ্রমিকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। শ্রমিকরা পাওয়ার প্ল্যান্টের ভিতরে শেডে ও বিভিন্ন গাড়িতে অগ্নিসংযোগ করে।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে পুলিশকে খবর দেয়া হলে পুলিশ ঘটনাস্থলে আসে। শ্রমিকদের মারামারি থামাতে গিয়ে পুলিশের সাথে শ্রমিকদের তুমুল সংঘর্ষ বেধে যায়। উত্তেজিত শ্রমিকরা পুলিশের ওপর হামলা চালায়। 

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিতে পুলিশ গুলি চালালে এই হতাহতের ঘটনা ঘটে। এই পর্যন্ত পাঁচজন নিহত হয়েছেন এবং পুলিশসহ আহত হয়েছেন অর্ধশতাধিক। আহতদের বাঁশখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে। 

গুরুতর আহতদের চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয়। শ্রমিকদের দেয়া আগুনে ৬টি মিক্সার ট্রাক, ১টি লরি ট্রাক, ১টি মাইক্রো, ২টি মোটর সাইকেল এবং বিদেশী কর্মকর্তাদের জন্য বানানো ২টি শেড পুড়ে গেছে বলে জানিয়েছেন বাঁশখালী ফায়ার সার্ভিসের টিম লিডার লিটন বৈষ্ণব।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতাল পুলিশ ফাঁড়ির সহকারী উপপরদির্শক (এএসআই) মো. আলাউদ্দিন বলেন, ‘সকালে বাঁশখালীতে সংঘর্ষের ঘটনায় এ পর্যন্ত আহত অবস্থায় মোট ১৩ শ্রমিক ও ৩ পুলিশ সদস্যকে ভর্তি করানো হয়েছে। তাদের অবস্থা গুরুতর।’

পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আনোয়ার হোসেন ঘটনাস্থল পরিদর্শ করেন। তিনি বলেছেন, বেতন-ভাতা নিয়ে শ্রমিকদের সঙ্গে কর্তৃপক্ষের বিরোধ চলছিল। সকালে ১২ দফা দাবিতে শ্রমিকরা বিক্ষোভ করে। 

বিভিন্ন স্থাপনা ও গাড়ি ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। এসময় তাদের নিভৃত করতে চাইলে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় আমাদের ছয় পুলিশ সদস্যও আহত হয়েছেন।” 

বাঁশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাইদুজ্জামান চৌধুরী বলেন, শ্রমিকিদের বেশকিছু দাবি-দাওয়া ছিল। এসব তারা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে দিতে চাচ্ছিল। শনিবার সকালে অসন্তোষ বাড়তে থাকে এবং পুলিশের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষে স্থানীয় লোকজনও জড়িয়ে পড়ে।”



Recent News

Available at

© 2019 - Maintained by EZEN Software & Technology Pvt. Ltd